তৃণমূলে ‘নাড়া’ দিয়েছে আ. লীগ, সাড়া পেয়েছে বিএনপি
ইউনিয়ন পর্যায়ে একই দিন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কর্মসূচি পালন করে তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাওয়ার কথা জানিয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে শান্তি সমাবেশ করে দলের নেতাকর্মীদের ভালো নাড়া দেওয়া গেছে। এর ফলে তাঁদের মধ্যে উৎসাহ সৃষ্টি হয়েছে। তৃণমূলে উজ্জীবিত নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে নেমেছিলেন বলেই বিএনপি দেশের কোথাও বড় ধরনের শক্তি প্রদর্শন করতে পারেনি।
আর বিএনপি নেতারা বলছেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে পদযাত্রা কর্মসূচিতে ভালো সাড়া পাওয়া গেছে। দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছিল। আওয়ামী লীগের বাধা পেরিয়ে নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততাই এ কর্মসূচির সফলতা। তাই সব মহানগরে পদযাত্রা কর্মসূচি শেষে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে একই কর্মসূচি দেওয়ার কথা ভাবছে দলটি।
গত শনিবার ইউনিয়ন পর্যায়ে বিএনপি পদযাত্রা ও আওয়ামী লীগ শান্তি সমাবেশ করে। এই কর্মসূচি ঘিরে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, গাড়ি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও গুলির ঘটনা ঘটে। এসব সংঘাতের জন্য দুই দলই পরস্পরকে দায়ী করছে।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায় মনে করছে, শনিবার সারা দেশে বিএনপির পাল্টা কর্মসূচি হিসেবে ইউনিয়ন পর্যায়ে শান্তি সমাবেশ করে দলের নেতাকর্মীদের দারুণভাবে উজ্জীবিত করা গেছে। নেতাকর্মীরা আগের চেয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। আগামী নির্বাচন পর্যন্ত দলের তৃণমূলে এ ঐক্য ধরে রাখতে পারলে নির্বাচনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তৃণমূলে কর্মসূচি দিয়ে একদিকে বিএনপির নৈরাজ্য সৃষ্টির অপচেষ্টা যেমন প্রতিহত করা গেছে, অন্যদিকে আমাদের নির্বাচনী প্রচারের কাজও শুরু হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে শান্তি সমাবেশ থেকে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড জনগণের সামনে তুলে ধরা শুরু হয়েছে। সরকারকে কেন ক্ষমতায় রাখা দরকার আর বিএনপি-জামায়াতকে কেন ভোট দেওয়া যাবে না, সে বিষয়গুলো আমরা জনগণের সামনে তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছি।’
দলীয় একটি সূত্র মতে, ইউনিয়ন পর্যায়ে শান্তি সমাবেশে কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্যরা। শান্তি সমাবেশের মধ্য দিয়ে অনেক জায়গায় সংসদ সদস্যদের সঙ্গে দলের তৃণমূলের নেতাদের দূরত্ব কিছুটা কমে এসেছে।
বিএনপির আন্দোলন কর্মসূচি ক্রমেই গতি হারাচ্ছে বলেও মনে করছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। ক্ষমতাসীন দলের কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের মতে, বিএনপির কর্মসূচিতে জনগণের কোনো সাড়া মিলছে না। জনগণ আন্দোলনে সম্পৃক্ত না হলে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পারবে না বিএনপি।
আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র কালের কণ্ঠকে জানিয়েছে, আগামী নির্বাচন পর্যন্ত নিয়মিত ‘শান্তি সমাবেশ’ কর্মসূচি পালন করে যাবে আওয়ামী লীগ। বিএনপির কর্মসূচির ধরন বুঝে শান্তি সমাবেশে নেতাকর্মী জমায়েত কম বা বেশি হবে। ফাঁকা মাঠে বিএনপির নেতাকর্মীরা যেন বড় কোনো শক্তি প্রদর্শন করতে না পারেন, সেদিকে কঠোর নজর থাকবে আওয়ামী লীগের। পাশাপাশি সারা দেশে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, নাশকতার মামলাগুলোর আসামিদের চাপে রাখবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী।
বিএনপির আন্দোলন কর্মসূচি প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘বিএনপির আন্দোলনে স্রোত হারিয়ে গেছে। বিএনপির আন্দোলন এখন গুরুতর আহত। আগামী নির্বাচন পর্যন্ত আমরা কর্মসূচি করে যাব। কোনো পাল্টাপাল্টি নয়। আমরা এক বছরের কর্মসূচি দিয়ে রেখেছি; কখনো শান্তি সমাবেশ, কখনো সম্মেলন, কখনো গণসংযোগ।’ তিনি গতকাল রবিবার রাজধানীর খিলগাঁওয়ে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশে এমন মন্তব্য করেন।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ একাধিক নেতা কালের কণ্ঠকে জানান, বিএনপি তাদের আন্দোলন কর্মসূচি সঠিক পথে এগিয়ে নিতে পারেনি। শুরুতে তাদের নেতাকর্মীদের মাঝে আন্দোলন নিয়ে বেশ উৎসাহ দেখা গেলেও এখন তাতে ভাটা পড়েছে। বিএনপি নির্বাচনে আসবে কি না তা নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি। ফলে নেতাকর্মীরা অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে হতাশ হয়ে পড়ছেন। এটি বিএনপিকে মোকাবেলা করা ক্ষমতাসীন দলের জন্য সুবিধা এনে দিচ্ছে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিএনপি ইউনিয়ন পর্যায়ে কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে নিজেদের হাস্যাস্পদে পরিণত করেছে। দেশের কোথাও তাদের নেতাকর্মীরা মাঠে নামেননি। জনগণের নিরাপত্তার জন্য আমাদের নেতাকর্মীরা মাঠে ছিলেন। আন্দোলন সফল করতে হলে জনগণের মন জয় করতে হবে। জনগণকে সম্পৃক্ত করতে না পারলে সেটা কোনো আন্দোলন হয় না। বিএনপির আন্দোলনের সঙ্গে জনসম্পৃক্ততা একেবারেই নেই।’
ময়মনসিংহ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল বলেন, ‘আমরা রাজপথে থাকলে বিএনপি-জামায়াত নাশকতা চালানোর সুযোগ পায় না। আমরা এ কৌশল নিয়েছি, কারণ ফাঁকা মাঠ পেলেই তারা দেশে একটা অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করবে।’
বাধা সত্ত্বেও মাঠে থাকাকে সফলতা ভাবছে বিএনপি : বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা মনে করছেন, এবারের কর্মসূচিতে প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের হামলা, বাধা, পুলিশের গুলি—সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা ছিল। এর পরও নেতাকর্মীরা মাঠে ছিলেন। পুলিশি বাধা অতিক্রম করার চেষ্টা করেছেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে মাঠে লড়াই করেছেন। এই সব কিছু দলের এই কর্মসূচির অর্জন।
সংঘর্ষের ঘটনায় জামালপুর, খুলনা, নোয়াখালী, সিরাজগঞ্জ, ধামরাই, ভালুকাসহ বিভিন্ন জায়গায় বিএনপি নেতাকর্মীদের আসামি করে মামলা করা হয়েছে। গাজীপুরের শ্রীপুরে বিএনপির পদযাত্রা কর্মসূচি থেকে অস্ত্র উঁচিয়ে স্লোগান দেওয়া জাহিদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
বিএনপি গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেছে, ৪৩ জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের কর্মসূচিতে হামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় দুই শতাধিক নেতাকর্মী গ্রেপ্তার এবং পাঁচ শতাধিক আহত হয়েছেন। বিএনপির শতাধিক নেতাকর্মীর বাড়িঘর-ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।
বিএনপি সূত্র জানায়, আজ সোমবার রাতে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে ইউনিয়ন পর্যায়ের কর্মসূচি নিয়ে পর্যালোচনা এবং পরবর্তী কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনা হবে।
দলের শীর্ষ নেতৃত্ব কর্মসূচি পালনে নেতাকর্মীদের দৃঢ়তায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। দলের নীতিনির্ধারকরা বলেন, হাট, বাজার ও গ্রামে গ্রামে বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে সাধারণ জনগণও কর্মসূচিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছে। মানুষ তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে মাঠে নেমেছে। এতে প্রমাণ হয়, প্রত্যন্ত অঞ্চলে সরকারবিরোধী জনমত গড়ে উঠেছে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল কালের কণ্ঠকে বলেন, কর্মসূচিতে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের হামলা, বাধার পরও নেতাকর্মীরা মাঠ ছেড়ে যাননি। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে নেতাকর্মীরা বেশি ঝুঁকি নিয়ে কর্মসূচি পালন করছেন। নেতাকর্মীদের এ ধরনের সাহসিকতা বড় আন্দোলনের কর্মসূচি গ্রহণে নীতিনির্ধারকদের উদ্বুদ্ধ করছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় কালের কণ্ঠকে বলেন, হয়রানির ভয়ে মানুষ প্রতিবাদ জানাতে পারে না। তৃণমূলের মানুষ প্রতিবাদ করার সুযোগ খুঁজছিল। বিএনপির কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণ তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে মাঠে নেমেছে। জনগণের প্রতিবাদের এই ভাষা সরকার না বুঝতে পারলে এ ধরনের কর্মসূচি থেকেই গণ-অভ্যুত্থানের সৃষ্টি হবে।
সংবাদ সম্মেলন : বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দিশাহারা হয়ে পড়েছে। দিশাহারা হয়ে তারা দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে বিএনপির পাল্টা কর্মসূচি দিচ্ছে।
গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ অভিযোগ করেন।
আওয়ামী লীগ পাল্টা কর্মসূচি দিয়ে সব জায়গায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ করেন খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন, পাল্টা কর্মসূচি যখন একটি রাজনৈতিক দল দেয়, তখন বুঝতে হবে, সেই দল একেবারে দেউলিয়া হয়ে গেছে। তিনি অভিযোগ করেন, আন্দোলনে ভীত হয়ে সরকার ইউনিয়ন পর্যায়ে শান্তিপূর্ণ পদযাত্রা বানচাল করতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও কিছুসংখ্যক পুলিশকে ব্যবহার করেছে।
যেসব জেলায় হামলার অভিযোগ : গতকাল গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, ফেনী, নওগাঁসহ ৪৩ জেলায় বিএনপির ওপর হামলা করা হয়েছে।
বিএনপি নেতাদের ধারণা, মহানগর পর্যায়ে যে পদযাত্রা কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে, সেখানেও পাল্টা কর্মসূচি দেবে আওয়ামী লীগ। পাল্টা কর্মসূচির কারণে মহানগরে হামলার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ বলেছে, নির্বাচনের আগ পর্যন্ত কর্মসূচি দিয়ে যাবে। আমি আহবান জানাচ্ছি, তারা যেন তাদের কর্মসূচির তারিখ এখনই ঘোষণা দিয়ে দেয়। তাহলে আমরা আমাদের কর্মসূচিগুলো অন্য তারিখে নিরাপদ স্থানে শান্তিপূর্ণভাবে করব। কিন্তু আমরা কর্মসূচি ঘোষণার পর আওয়ামী লীগ যদি কর্মসূচি ঘোষণা দেয়, তাহলে বুঝে নিতে হবে, ইচ্ছাকৃতভাবে তারা দেশে একটা গণ্ডগোল লাগানোর চেষ্টা করছে।’
মামলা : জামালপুর সদর থানায় বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ পৃথক দুটি মামলা করেছে। এতে ৮৯ জন নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। সেখানে দলটির ১৪ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সিরাজগঞ্জ সদর থানায় পুলিশ ও আওয়ামী লীগ ৪৯৩ জন বিএনপি নেতাকর্মীর নামে দুটি মামলা করেছে। এসব মামলায় ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নোয়াখালীতে বিএনপির পদযাত্রা ঘিরে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনায় দলটির ২০২ জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে তিন থানায় পৃথক তিনটি মামলা হয়েছে। এসব মামলার এজাহারে ৪২ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তিন মামলায় পুলিশ সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে। শনিবার রাতে সেনবাগ, বেগমগঞ্জ ও সুধারাম (সদর) থানায় মামলাগুলো করা হয়। এর মধ্যে সেনবাগ থানায় হওয়া মামলার বাদী পুলিশ। আর বাকি দুটি মামলার বাদী আওয়ামী লীগের দুই নেতা।
পদযাত্রায় সংঘর্ষের ঘটনায় ধামরাইয়ে আওয়ামী লীগের এক নেতা বাদী হয়েছে মামলা করেছেন। ময়মনসিংহের ভালুকায় ১৮১ জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করে পুলিশ। খুলনায় ডুমুরিয়া থানার পুলিশ বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাসহ ১৩০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।

No comments